ষষ্ঠ প্রস্তাব: বিবিধ

ষষ্ঠ প্রস্তাব
(বিবিধ)
১। আদম কি আদি মানব?
হিন্দু মতে- ব্রহ্মার মানসপুত্র “মনু” হইতে মানব উৎপত্তি। ইহুদী, খৃষ্টান ও মুসলমানদের মতে- “আদম” হইতে আদ্‌মী বা মানুষ উৎপত্তি হইয়াছে এবং পারসিকগণের মতে- আদি মানব “গেও-মাড”।
জীবতত্ত্ববিদ পণ্ডিতগণের মতে, জীবসৃষ্টির আদিতে অতিক্ষুদ্র এককোষবিশিষ্ট জীব “এ্যামিবা” (Amoeba)
ক্রমবিবর্তন ও ক্রমবিবর্ধনের ফলে প্রথমে ব্যাক্টেরিয়া, তাহা হইতে স্পঞ্জ, মৎস্য, সরীসৃপ, পশু ইত্যাদি বহু কোষী জীবে রূপান্তরিত হইয়া শেষে বন-মানুষ (Anthropoides) ও তাহাদের ক্রমোন্নতির ফলে বর্তমান সভ্য মানুষ উৎপত্তি হইয়াছে। কয়েক কোটি বৎসর পূর্বে পৃথিবীর অবিচ্ছিন্ন জলরাশিতে “এ্যামিবা” জন্মলাভ করিয়াছিল এবং বিবর্তনের ফলে তাহা হইতে পৃথিবীর সর্বত্র নানাবিধ জীব সৃষ্টি হইয়াছে।
মানুষের আদি জন্ম সম্পর্কে এ সকল ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ শুনিয়া সাধারণ লোক কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছিতে পারে কি? যে সম্প্রদায়ের মধ্যে যে মতবাদ প্রচলিত আছে, তাহারা মানুষকে সেই মতবাদই বিশ্বাস করাইতে চায়। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে ইহাতে যে সকল প্রশ্ন জাগে, তাহার কিছু আলোচনা করা যা’ক।
হিন্দু মতে- মনুর জন্ম ভারতে এবং খৃষ্টানাদি সেমিটিক জাতির মতে আদমের প্রথম বাসস্থান আরব দেশ। অন্যান্য যে কোন মতেই হউক, মানুষের আদি জন্ম এশিয়ার বাহিরে নয়।
আদি মানব যদি এশিয়ায়ই জন্মলাভ করিয়া থাকিত, তাহা হইলে বংশ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এবং ইউরোপ ও আফ্রিকার মধ্যেই বসতি বিস্তার ঘটিত। কেননা ইহারা পরস্পর প্রায় অবিচ্ছিন্ন। কিন্তু আমেরিকা ও অষ্ট্রেলিয়ার আদিম অধিবাসীগণ কি প্রকারে জন্মিল? কলম্বাস সাহেবের আমেরিকা ও ক্যাপ্টেন “কুক”-এর অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কারের পূর্বে, সেখানে কি কোন লোক যাতায়াতের প্রমাণ আছে?
আদম যেখানে বাস করিতেন, তাহার নাম ছিল “এদন উদ্যান”। সেই উদ্যানটি বর্তমান তুরস্ক দেশের পূর্বাঞ্চলে ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রীস (ফরাৎ ও হিদ্দেকল) নদীদ্বয়ের উৎপত্তির এলাকার মধ্যে অবস্থিত ছিল (৮ নং টীকা দ্রষ্টব্য)। মহাপ্রভুর নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণের অপরাধে আদম এদন উদ্যান হইতে বিতাড়িত হইয়া বহু বৎসর ঘোরাফেরার পর আরবের আরাফাতে তাঁহার স্ত্রীর সহিত মিলিত হন এবং ঐ অঞ্চলেই কালাতিপাত করেন।
আদিকালে পৃথিবীতে মানুষ ছিল অল্প এবং ভূ-পৃষ্ঠের সর্বত্র মানুষের বসতি ছিল না, ছিল উর্বর অঞ্চলে। তাই প্রথম লোক বসতি ও সভ্যতা বৃদ্ধি পাইয়াছিল নীল, ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রীস নদী বিধৌত মিশর ও মেসোপমিয়ায় এবং ভারতের সিন্ধু নদের অববাহিকা অঞ্চলে। কালদিয়া, ব্যাবিলোনিয়া প্রভৃতি দেশগুলিও ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রীস নদীর অববাহিকা অঞ্চল এবং “এদন” স্থানটিও তাহাই।
জীব বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাব ঘটিয়াছে মাত্র প্রায় ৩০ হাজার বৎসর পূর্বে। আদমের আবির্ভাবের সমকালে বা তারও পূর্বে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে যে মানুষের বসতি ছিল, ভূতত্ত্ব ও প্রত্নতত্ত্ববিদগণ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল হইতে তার ভুরি ভুরি প্রমাণ পাইয়াছেন।
চীন ও ভারতীয়দের ন্যায় দূরদেশের কথা না-ই বলিলাম, আরবের নিকটবর্তী- মিশর, প্যালেস্টাইন ও ব্যাবিলোন ইত্যাদির মত স্থানে মানব সভ্যতার যে অজস্র নিদর্শন পাওয়া গিয়াছে, নিম্নে তার মধ্যে মাত্র কয়েকটির আলোচনা করা যাইতেছে, যাহা আদমের সমকালীন বা তারও পূর্বের বলিয়া সাক্ষ্য দেয়। যথা-
খৃঃ পূর্বঃ ৪০০৪ সালে হজরত আদম সৃষ্টি হয়।
খৃঃ পূর্বঃ ৩০৭৪ সালে হজরত আদমের মৃত্যু হয়।
খৃঃ পূর্বঃ ৪২৪১ সালে মিশরে সিরিয়াস নক্ষত্রের আবিষ্কার হইতে বর্ষ গণনা আরম্ভ হয়।
খৃঃ পূর্বঃ ৪৪৪১ সালে মিশরে “সোথিক চক্র” আবিষ্কৃত হয়। (ঊষাকালে উদয় হইতে মহাকাশ প্রদক্ষিণ করিয়া
সিরিয়াস নক্ষত্রটির আবার পূর্ব স্থানে ফিরিয়া আসিতে সময় লাগে প্রায় ১৪০০ বৎসর। এই
সুদীর্ঘ কালটিকে বলা হয় “সোথিক চক্র”)।
খৃঃ পূর্বঃ ৪২২১ সালে মিশরে পঞ্জিকা আবিস্কৃত হয়।
খৃঃ পূর্বঃ ৩০৯৮-৩০৭৫ সালে মিশরে নীলনদের পশ্চিমে গিজাতে রাজা খুপুর সমাধির উপর ১৩ একর জমি
ব্যাপিয়া ৪৮১ ফুট উঁচু একটি পিরামিড তৈয়ার হয় (৪৩)।
খৃঃ পূর্বঃ ৫০০০ সালের তৈয়ারী পাথরের হাতিয়ারের সহিত সোনা, রূপা, তামা প্রভৃতি ধাতুর জিনিস পাওয়া
গিয়াছে মিশরের অন্তর্গত নেগাদা, এমিডোস, এল-আমরা প্রভৃতি অঞ্চলের কবরগুলিতে।
খৃঃ পূর্বঃ ৪০০০ সালে মিশরে চাষাবাদ ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া গিয়াছে নীল নদের পশ্চিমে ফাইয়ুম ও
মেরিমডে অঞ্চলে এবং মধ্য ইরানের পশ্চিম সীমান্তে “সিয়াল্ফ্‌” অঞ্চলে।
খৃঃ পূর্বঃ ৫০০৮-৪৫০০ সালে প্যালেস্টাইনের কারমেল পাহাড়ের “ওয়াদি-এল-নাটুর্ফ” স্থানের প্রাচীন অধিবাসী নাটুফিয়ানরা কিছু চাষাবাদ করিত তার প্রমাণ আছে।
খৃঃ পূর্ব ৪৩০০ সালের পূর্বের লোক বসতির প্রমাণ পাওয়া গিয়াছে- পশ্চিম ইরানের কাশানের কাছাকাছি “টেল-শিয়াল্‌ফ” নামক স্থানে। সেখানে ১৭টি ভগ্ন স্তূপে ৯৯ ফুট উঁচু একটি ঢিবির সব চাইতে নীচের ভগ্নস্তূপটিতে লোক বসতির প্রমাণ পাওয়া গিয়াছে।
খৃঃ পূর্ব ৭০০০ সালে লোক বসতির প্রমাণ পাওয়া গিয়াছে- মোসালের নিকটস্থ “টেপ পাওয়া”তে। সেখানে ২৬টি ভগ্নস্তূপ মিলিয়া ১০৪ ফুট উঁচু একটি ঢিবির সব চাইতে নীচের ভগ্নস্তূপটিতে লোকের বসতি ছিল।
খৃঃ পূর্ব ৩৪০০ সালে মিশরে রাজা মেনেসের রাজত্ব আরম্ভ হয়।
খৃঃ পূর্ব ৮০০০ সালে লোক বসতির প্রমাণ পাওয়া গিয়াছে- সিরিয়ার উত্তর উপকূলে “বাস-সামরা”তে। সেখানে ৪০ ফুট উঁচু একটি ঢিবির নীচে লোক বসতির চিহ্ন আছে (৪৪)।
পবিত্র তৌরিত গ্রন্থে বর্ণিত আছে- “আর সদা প্রভু ঈশ্বর পূর্ব দিকে এদনে, এক উদ্যান প্রস্তুত করিলেন, এবং সেই স্থানে আপনার নির্মিত ঐ মনুষ্যকে রাখিলেন। আর সদা প্রভু ঈশ্বর ভূমি হইতে সর্ব জাতীয় সুদৃশ্য ও সুখদায়ক বৃক্ষ, এবং সেই উদ্যানের মধ্যস্থানে জীবন বৃক্ষ ও সদসদ জ্ঞানদায়ক বৃক্ষ উৎপন্ন করিলেন। আর উদ্যানে জল সেচনার্থে এদন হইতে এক নদী নির্গত হইল, উহা তথা হইতে বিভিন্ন হইয়া চতুর্মুখ হইল,” (৪৫) ।
উক্ত বিবরণে দেখা যায় যে, সদা প্রভু পূর্ব দিক এদনে এক উদ্যান প্রস্তুত করিলেন। কিন্তু উহা কোন্‌ স্থান হইতে পূর্ব অর্থাৎ আদমের সৃষ্টি স্থান, না তৌরিত লেখকের বাসস্থান, তাহা স্পষ্ট বোধগম্য হয় না। হয়ত লেখকের বাসস্থান হইতে হইবে। তৌরিতের লেখক বোধ হয় যে, কেনান দেশের হিব্রু সম্প্রদায়ের কোন অনামা ব্যক্তি ছিলেন এবং “এদন” স্থানটি কেনান দেশ হইতে প্রায় পূর্ব দিকে অবস্থিত ছিল।
তৌরিতের বর্ণনা মতে- সদাপ্রভু ভূমি হইতে সর্ব জাতীয় “সুদৃশ্য” ও “সুখাদ্যদায়ক” বৃক্ষ ঐ বাগানে উৎপন্ন করিলেন। সচরাচর আমরা দেখিয়া থাকি যে, পরমেশ্বরের সৃষ্ট (প্রকৃতিজাত) গাছ-গাছড়ার সমাবেশকে কখনও “বাগান” বলা যায় না, বলা যায়- “বন” বা “জঙ্গল”। কেননা জল, বায়ু তাপের আনুকূল্যে উর্বর মাটিতে হরেক রকম উদ্ভিদই জন্মিয়া থাকে এবং উহাতে সুখাদ্য, কুখাদ্য ও সুদৃশ্য বৃক্ষের হয় একত্র সমাবেশ। অবাঞ্ছিত বৃক্ষোৎপাটন পূর্বক “বাঞ্ছিত বৃক্ষ সমাবেশ” কে বলা হয় “উদ্যান” বা ‘“বাগান”। এই “বাগান” সর্বত্রই মানুষের তৈয়ার, ঈশ্বরের নহে। যেমন স্বর্ণ, রোপ্য ইত্যাদি ঈশ্বর-সৃষ্টি (প্রকৃতিজাত) হইলেও অলঙ্কারসমূহ মানুষের তৈয়ারী, কোন অলঙ্কারই ঈশ্বর-সৃষ্ট নহে। কাজেই বলা যাতে পারে যে, এদনের ঐ উদ্যানটি মানুষের তৈয়ারী ছিল, পরমেশ্বরের নহে।
জীবতত্ত্ববিদগণের মতে, মানুষ এককালে গুহাবাসী ছিল এবং বন্য ফলমূল ভক্ষণ করিত। নিয়মিত ফলমূল সংগ্রহ করা দুঃসাধ্য কাজ, হয়ত বা ফলমূল দুষ্প্রাপ্যও ছিল। তাই আদিম মানবরা রুচিসম্মত ও সুখাদ্যদায়ক বৃক্ষাদি কোন নির্দিষ্ট স্থানে রোপণ করিয়া খাদ্যের ব্যাপারে স্বনির্ভর হইতে চেষ্টা করিয়াছিল। মানব সভ্যতার আদিতে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে এইরূপ “বাগান চাষ”-এর প্রচলন হইয়াছিল। এমতাবস্থায় মনে উদয় হতে পারে যে, এদনের উল্লেখিত উদ্যানটি ঐরূপ একটি বাগান চাষেরই ক্ষেত্র।
আদম সৃষ্টি হইয়া সেইদিন বা তার পরের দিন হইতে ঐ বাগানের ফল ভক্ষণ শুরু করিয়াছিলেন। কোন ফলের বীজ রোপিত হইলে তাহাতে বৃক্ষোৎপন্ন হইয়া দুই-চারদিনের মধ্যেই ফল ধরে না, উহাতে বেশ কয়েক বৎসর সময়ের দরকার হয়। কাজেই একথা স্বীকার্য যে, ঐ বাগানের ফলোৎপাদক বৃক্ষসমূহ আদম সৃষ্টির বহুদনি পূর্বে রোপিত হইয়াছিল। এদন উদ্যানটি পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থিত ছিল। কাজেই ওখানকার বাগানে জলসেচের গুরুত্ব ও আবশ্যকতা ছিল অত্যধিক, তাহা তৌরিত গ্রন্থে উল্লেখ আছে নিয়মিত জল সেচের সামান্য ত্রুটিতেও বাগানটি নষ্ট হইয়া যাইত। কিন্তু তাহা হয় নাই। ইহাতে প্রশ্ন আসে যে, আদম সৃষ্টির পূর্বে উহার সেচকার্য করিত কে? উত্তরে স্বভাবতই মনে আসে যে, আদমের পূর্বেও মানুষ ছিল।
সেচকার্য করিত “কে”, না বলিয়া “কাহারা” বলাই সঙ্গত। কেননা সেই সেচকার্য সম্পাদন করা কাহারো একার পক্ষে সম্ভব ছিল না। যেহেতু বাগানটি আয়তনে ছোট ছিল না, বেশ বড়ই ছিল। তৌরিতে বর্ণিত আছে “পরে তাহারা সদা প্রভু ঈশ্বরের রব শুনিতে পাইলেন, তিনি দিবাবসানে উদ্যানে গমনাগমন করিতেছিলেন, তাহাতে আদম ও তাঁহার স্ত্রী সদা প্রভু ঈশ্বরের সন্মুখ হইতে উদ্যানস্থ বৃক্ষসমূহের মধ্যে লুকাইলেন” (৪৬)। যেহেতু আদম তখন উলঙ্গ ছিলেন।
“বৃক্ষ” বৃক্ষই, উহা লতা-গুল্ম বা ঝোপ নহে। আদম লুকাইয়া ছিলেন উদ্যানস্থ “বৃক্ষসমূহের” মধ্যে, কোন একটি বিশেষ বৃক্ষের আড়ালে বা কোন ঝোপের মধ্যে নহে। আম, জাম, তাল, নারিকেল বিশেষত খেজুর (খুরমা) ইত্যাদি বৃক্ষের গোটা কাণ্ডই শাখা-পত্রহীন এবং উহাদের অবস্থানও সাধারণত দূরে দূরে। অধিকন্তু “স্বর্গ” নামধেয় “এদন উদ্যান”টিতে যে ঝোপ-জঙ্গল ছিল না, তাহাও নিশ্চিত। এমতাবস্থায় ওখানে কোন লোক কাহারো দৃষ্টির আড়ালে হইতে হইলে, তাহার যে কতটুকু দূরে যাওয়া আবশ্যক তাহা অনুমান সাপেক্ষ। এহেন বাগানটির রক্ষণাবেক্ষণ যথা- কোপান (বোধ হয় সেটা ছিল লাঙ্গল চাষের পূর্ববর্তী কোদাল যুগ (৪৭) বীজ সংগ্রহ ও উহা রোপণ-বপন বিশেষত জল সেচ ইত্যাদি কাজে বহু লোকের আবশ্যক ছিল এবং আবশ্যক ছিল তাহাদের কঠোর পরিশ্রমের।
বহু লোকের একত্রে বসবাস এবং কোন এক সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ করিতে হইলে একজন অধিনায়কও থাকা দরকার। আর ইহা একটি চিরাচরিত নিয়ম যে অধিনায়কের আদেশ অমান্যকারী ব্যক্তি শাস্তির যোগ্য।
শোনা যায় যে, স্বর্গবাসীরা কোনরূপ কায়িক শ্রম করেন না। এমন কি কোন বৃক্ষের ফলও তাঁহারা ছিড়িয়া খাননা বা উহা হাতে ধরিয়া মুখেও দেন না, ঈপ্সিত ফল আপনি আসিয়াই স্বর্গবাসীর মুখে প্রবেশ করে। মনে হয় যে, এদন উদ্যানে আদম ছিলেন উদ্যানের অন্যান্যদের বিশেষত অধিনায়কের (প্রভুর) অপ্রীতিভাজন।
প্রখ্যাত সমাজ বিজ্ঞানী মর্গানের মতে- আদি মানবরা দলবদ্ধ হইয়া বসবাস করিত। সেই দল বা সমাজ ছিল জ্ঞাতি ভিত্তিক। দলের প্রত্যেকের সহিত প্রত্যেকের থাকিত জ্ঞাতি সম্পর্ক। মর্গান তাহার নাম দিয়াছিলেন “জেনটাইল সোসাইটি” বা জ্ঞাতি ভিত্তিক সমাজ বা “ক্লান”। ক্লানের বাসিন্দারা সকলে মিলিয়া মিশিয়া কাজ করিত। হয়ত এরূপ নিয়মও ছিল যে, কোন ব্যক্তি কোন কাজ না করিলে তার জন্য ক্লান উৎপন্ন ফলাদি ভক্ষণ নিষিদ্ধ। ক্লানের নিয়ম মানিয়া, সকলের উপর নির্ভর করিয়া, সকলের সহযোগিতায় বাঁচার চেষ্টা করিলেই বাঁচা সম্ভব ছিল, নচেৎ নয়। কোন দল হইতে কেহ বিতাড়িত হইলে, সে বনে-জঙ্গলে ও পাহাড়-পর্বতে ঘুরিতে ঘুরিতে দিশাহারা হইত, বা মারা যাইত (৩৭)।
পূর্বোক্ত বিষয়গুলি পর্যালোচনা করিলে মনে আসিতে পারে যে, আদম হয়ত এশিয়া মাইনর বা আর্মেনিয়া দেশের কোন ক্লানের বিতাড়িত ব্যক্তি এবং আরব দেশে আগন্তক প্রথম মানুষ, সমস্ত পৃথিবীর মধ্যে আদিম মানুষ নয়। হজরত আদমের আদিত্বের বাস্তব ও তত্ত্বগত কোন কোন প্রমাণ আছে কি?
২। নীল নদের জল শুকাইল কেন?
কেহ কেহ বলেন যে, ফেরাউনের দাসত্বমুক্ত হইয়া বনিইস্রায়েলগণ মিশর দেশ ত্যাগ করিয়া স্বদেশ (কেনান দেশে) আসিবার সময় নীল নদী পার হইয়াছিলেন। কিন্তু বাস্তবিক তাহা নহে। বনিইস্রায়েলগণ মিশরের যে অঞ্চলে বাস করিতেন, তাহার নাম ‘গোশন’ বা ‘রামিষেষ’ প্রদেশ। নীল নদী ইহার পশ্চিমে অবস্থিত। কাজেই ওখান হইতে কেনান দেশে (পূর্বদিকে) আসিতে হইলে নীল নদী পার হইতে হয় না, পার হইতে হয়- লোহিত সাগর বা সুয়েজ উপসাগর অথবা মোররাত বা তিমছাহ্‌ হৃদ। তৌরিতে বলা হইয়াছে-সুপ সাগর।
ধর্মযাজকগণ বলেন যে খোদাতা’লার হুকুমে হজরত মুসা তাঁর হাতের (লাঠি) দ্বারা জলের উপর আঘাত করিতেই নদীর এপার হইতে ওপার পর্যন্ত একটা (মতান্তরে বারটি) রাস্তা হইয়া গেল এবং রাস্তার উভয় পার্শ্বে প্রাচীরের আকারে জলরাশি দাঁড়াইয়া রহিল। জলধির তলদেশ দিয়া শুকনা পথে বনি ইস্রায়েলগণ এপারে আসিলে ফেরাউন সসৈন্যে ঐ পথ দিয়া বনিইস্রায়েলগণের পশ্চাদ্ধাবন করিল। ফেরাউন ঐ পথের মধ্যভাগে আসিলে হঠাৎ জল প্রাচীর ভাঙ্গিয়া পড়িল এর ফেরাউন সদলে ডুবিয়া মরিল।
আবার কেহ কেহ বলিয়া থাকেন যে, বনি ইস্রায়েলদের বারোটি বংশ বা দলের জন্য বারোটি ভিন্ন ভিন্ন রাস্তা হইয়াছিল এবং প্রত্যেক রাস্তার মাঝখানে জলের প্রাচীর ছিল। ঐ সকল রাস্তায় চলিবার কালে এক দলের লোক অন্য দলের লোককে দেখিতে না পাইয়া উদ্বিগ্ন হইলে ঐ সকল প্রাচীরের গায়ে জানালা এবং খিড়কীও হইয়াছিল।
বলা হইয়া থাকে যে, আল্লাহ্‌ হায়াত, মউত, রেজেক ও দৌলত এই চারিটি বিষয় ভিন্ন আর সমস্ত কাজের ক্ষমতাই মানুষকে দান করিয়াছেন। আল্লাহ মানুষকে শিখাইয়াছেন- রেল, স্টিমার, হাওয়াই জাহাজ, ডুবো জাহাজ ও রকেট তৈয়ারী করিতে; তিনি শিখাইয়াছেন- টেলিগ্রাফ, টেলিফোন, রেডিও ও টেলিভিশন তৈয়ার করিতে এবং আরও কত কিছু। কিন্তু এই পারমাণবিক যুগের কোন মানুষকে আজ পর্যন্ত আল্লাহ জলের দ্বারা (বরফের নহে)- প্রাচীর, জানালা, খিড়কী-কবাট ইত্যাদি তৈয়ার করা শিক্ষা দিলেন না কেন?
কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক হইলেও এখানে আর একটি বিষয়ের অবতারণা করিতেছি। ধর্মযাজকদের কথিত- জলের প্রাচীর ও খিড়কী-কবাটাদির আখ্যান কতটুকু সত্য তাহা জানি না; কিন্তু “ফেরাউন”-এর মৃত্যুটা সম্পূর্ণ সত্য নহে। অনেকে মনে করেন যে, “ফেরাউন” কোন বিশেষ ব্যক্তির নাম এবং সে হাজার বৎসর জীবিত ছিল। আসলে “ফেরাউন” কোন ব্যক্তি বিশেষের নাম নয় এবং হাজার বছর বাঁচিয়াও ছিল না। সেকালের মিশরাধিপতিদের উপাধি ছিল “ফেরাউন”। ফেরাউনদের মধ্যে কেহ কেহ দুর্দান্ত ছিল বটে, কিন্তু কেহ কেহ ছিলেন গুণী, জ্ঞানী ও মহান ব্যক্তিত্বের অধিকারী। হজরত মূসার আমলে মিশরের ফেরাউন বা সম্রাট ছিলেন প্রথম “সেটি”র পুত্র দ্বিতীয় “রেমেসিস”। হজরত মূসার জন্মের আগের বৎসর খৃষ্টপূর্ব ১৩৫২ সালে তিনি সিংহাসন লাভ করেন এবং ৬৭ বৎসর রাজত্ব করিয়া খৃষ্টপূর্ব ১২৮৫ সালে জলামগ্ন হইয়া প্রাণ ত্যাগ করেন (২৪)। ফেরাউন দ্বিতীয় রেমেসিস হাজার বৎসর জীবিত ছিলেন না। তবে তাঁর- “ফেরাউন”, এই উপাধিটা জীবিত থাকিতে পারে।
শোনা যায় যে, মিশরে ইস্রায়েল বংশের প্রতিষ্ঠাতা হজরত ইউসুফকে কূপ হইতে তুলিয়া লইয়া বণিকগণ কেনান দেশ হইতে মিশরে নিয়া বিক্রয় করিয়াছিল। হজরত ইউসুফের ভাইগণ কেনানে দুর্ভিক্ষের সময় স্বদেশ হইতে মিশরে যাইয়া একাধিক বার খাদ্যশস্য আনিয়াছিলেন এবং শেষবারে হজরত ইয়াকুব নবীকে সঙ্গে লইয়া সপরিবারে কেনান দেশ হইতে মিশরে যাইয়া সেখানে তাঁহারা স্থায়ীভাবে বসবাস করিয়াছিলেন। উহাতে তাঁহারা কেহ কখনও নদী বা সাগরে বাধা পান নাই। কিন্তু হজরত মূসা বাধা পাইলেন কেন?
বলা যাইতে পারে যে, পূর্ববর্তী মিশর ভ্রমণকারী কেনানীয়রা যে পথে মিশরে যাতায়াত করিতেন, হজরত
মূসা “পলাতক” বলিয়া সেপথে না চলিয়া শত্রুর অনুগমন ব্যর্থ করিবার জন্য বাঁকা পথে চলিয়া লোহিত সাগর বা সুয়েজ উপসাগর পার হইয়া সীসনয় বা তূর পর্বতে পৌঁছিয়াছিলেন।
বনি ইস্রায়েলগণের মিশর ত্যাগ করাটাকে কেহ কেহ ‘পলায়ন’ বলিয়া থাকেন। কিন্তু আসলে উহা পলায়ন বা গোপন ব্যাপার ছিল না। হজরত মূসার অভিশাপে নাকি ফেরাউন ও তাঁর জাতির উপর ভয়ানক গজব নাজেল হইয়াছিল। সেই গজবে অতিষ্ঠ হইয়া ফেরাউন বনি ইস্রায়েলগণকে তাঁহাদের স্বদেশে যাইতে অনুমতি দিয়াছিলেন। বিশেষত বিশাল পশুপাল ও যাবতীয় মালামালসহ বনি ইস্রায়েলদের যে সুপাবিশাল বাহিনী সংগঠিত হইয়াছিল তাহাতে নারী ও শিশু ছাড়া শুধু পুরুষের সংখ্যাই ছিল ছয় লক্ষ (২৫)। এত লোকের রাষ্ট্রত্যাগ করার ঘটনাকে পলায়ন বা গোপন ব্যাপার বলা যায় কিরূপে? হজরত মূসার মিশর ত্যাগ সম্বন্ধে তৌরিত কেতাবে নিম্নলিখিত বিবরণ পাওয়া যায়। যথা- “তখন রাত্রিকালেই ফরৌণ মোশি ও হারোনকে ডাকাইয়া বলিলেন, তোমরা উঠ, ইস্রায়েলদিগকে লইয়া আর প্রজাদের মধ্য হইতে বাহির হও, তোমাদের কথানুসারে মেষপাল ও গো-পাল সঙ্গে লইয়া চলিয়া যাও এবং আমাকেও আর্শীবাদ কর। ..আর সদাপ্রভু মিশ্রীয়দের দৃষ্টিতে তাহাদিগকে (বনি ইস্রায়েলগণকে) অনুগ্রহ পাত্র করিলেন, তাই তাহারা যাহা চাহিল মিশ্রীয়রা তাহাদিগকে তাহাই দিল। এইরূপে তাহারা মিশ্রীয়দের ধন হরণ করিল (২৬)।”
উক্ত বিবরণে দেখা যায়, তখন ফেরাউন ও মিশরবাসীগণ সরল মনেই বনি ইস্রায়েলগণকে মিশর ত্যাগ করিতে আদেশ দিয়েছিলেন। তাঁহারা তখন ভাবিতেছিলেন যে, বনি ইস্রায়েলগণ তাঁহাদের দেশের আপদস্বরূপ, উহাদিগকে দেশ হইতে তাড়াইতে পারিলেই তাঁহারা নিরাপদ হইবে। তাই তাঁহারা বিস্তর ধনরত্ন দিয়াও বনি ইস্রায়েলগণকে তাঁহাদের স্বদেশে যাইবার সাহায্য করিয়াছিলেন। অবশ্য মিশরীয়দের এই মনোভাবের পরিবর্তন হইয়াছিল, কিন্তু তাহা অনেক পরে। পুনঃ বনি ইস্রায়েলগণকে আটক করিবার ইচ্ছা ফেরাউনের যখন হইয়াছিল, তখন পর্যন্ত বনি ইস্রায়েলগণ মিশর অতিক্রম করিয়া “পীহহীরোত” নামক স্থানের নিকট সমুদ্রতীরে শিবির স্থাপনান্তে বিশ্রাম করিতেছিলেন। এমতাবস্থা হজরত মূসা নিশিন্ত মনে সহজ ও সরলপথে পূর্বদিকে (স্বদেশের দিকে) না চলিয়া, বাঁকা পথ ধরিয়া প্রায় দুইশত মাইল দক্ষিণে যাইয়া লোহিত সাগর পাড়ি দেওয়ার হেতু কি?
কেহ কেহ বলেন যে, হজরত মূসা যে জলাশয় পার হইয়াছিলেন, পূর্বে উহা ভূমধ্যসাগরের সাথে যুক্ত ছিল এবং উহার গভীরতা ছিল নিতান্ত কম। উহা ভূমধ্যসাগরের পূর্বাংশে অবস্থিত ছিল বলিয়া পূর্বীয় বায়ু প্রবাহের দরুন ভূমধ্যসাগরের পূর্বাংশের জল হ্রাস হইলে উহা সম্পূর্ণ শুকাইয়া যাইত এবং ঐ বায়ুপ্রবাহ বন্ধ হইলে পুনরায় উহা জলপূর্ণ হইত। যেমন- আমাদের বাংলাদেশের দক্ষিণ বায়ুপ্রবাহে জল কমিয়া যায়। ইহার ফলে নদী ও উপকূল-ভাগের অগভীর স্থান শুকাইয়া যায়। এই মতের অনুকূলে তৌরিত গ্রন্থে একটি বিবরণ পাওয়া যায়। বিবরণটি এইরূপ- “তাহাতে সদা প্রভু সেই সমস্ত রাত্রি পূর্বীয় বায়ু দ্বারা সমুদ্রকে সরাইয়া দিলেন ও তাহা বিশুষ্ক করিলেন। তাহাতে জল (গভীর ও অগভীর) দুই ভাগ হইল আর ইস্রায়েল সন্তানেরা শুষ্ক পথে সমুদ্র মধ্যে প্রবেশ করিলে (২৭)।”
উক্ত বিবরণে দেখা যায় যে, ঐ তারিখে সমস্ত রাত্রি পূর্বদিকে হইতে বায়ু প্রবাহিত হইয়াছিল। অর্থাৎ প্রায় বার ঘণ্টা স্থায়ী বন্যা হইয়াছিল। কাজেই অগভীর জলাশয়টি শুকাইয়া যাওয়ায় বনিইস্রায়েলগণ প্রায় শুকনা পথেই উহা পার হইয়াছিলেন। উহাদের পথানুসরণ করিয়া ফেরাউন যখন ঐ জলাশয়ের মধ্যভাগে আসিলেন, তখন রাত্রি শেষ হইয়াছিল এবং বন্যাও থামিয়াছিল। কাজেই তখন অতি দ্রুত ভূমধ্যসাগরের জল আসিয়া ফেরাউনকে ডুবাইয়া মারিল। যেহেতু পূর্বীয় বায়ু কেবলমাত্র রাত্রেই প্রবাহিত হইয়াছিল এবং ভোরে উহা থামিয়াছিল। এই মর্মে তৌরিতের অন্যত্র লিখিত আছে “তখন মোশি (মুসা) সমুদ্রের উপর হস্ত বিস্তার করিলেন, আর প্রাতঃকাল হইতে না হইতে সমুদ্র সমান হইয়া গেল। তাহাতে মিশ্রীয়েরা তাহার দিকেই পলায়ন করিল, আর সদা প্রভু সমুদ্রের মধ্যে মিশ্রীয়দিগকে ঠেলিয়া দিলেন (২৮)।”
অধুনা কোন কোন গবেষক বলেন যে, হজরত মূসা ‘তিমছাহ্‌ হ্রদ’ পার হইয়াছিলেন। তখন উহাতে জোয়ার-ভাটা হইত। হ্রদ বা সমুদ্রোপকূলের জোয়ার-ভাটা এক আশ্চর্য ব্যাপার। আমাদের বঙ্গোপসাগরের উপকূলে এরূপ দৃশ্য হয়ত কেহ কেহ দেখিয়া থাকিবেন। উহাকে ‘সরডাকা’ বা ‘বানডাকা’ বলে।
ভাটার শেষে যেখানে শুকনা ভূমি দেখা যায়, জোয়ার হওয়া মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে সেখানে হয় অথৈ জল। ঐ জল এত দ্রুত বেগে আসিয়া থাকে যে, পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকিলে, ওখানে যাইয়া কেহই বাঁচিতে পারে না। এমন কি সময় সময় অভিজ্ঞ লোকও মারা পড়ে।
ঐরূপ জলাশয় পার হইবার বিপদ ও উপায় অর্থাৎ জোয়ার ও ভাটা সম্বন্ধে বনিইস্রায়েলগণ বোধ হয় পূর্বেই জ্ঞাত ছিলেন। হয়ত তাঁহারা জানিতেন যে ভাটার প্রথমাবস্থায় ওপার হইতে যাত্রা না করিলে জোয়ারের পূর্বে এপারে পৌঁছিতে পারা যায় না। তাই ভাটার প্রথমবস্থায় হ্রদে কিছু জল থাকিতেই হজরত মুসা তার হাতের আশা দ্বারা (অন্ধের পথ চলিবার মত) অগভীর স্থান নির্ণয় পূর্বক সদলে হ্রদ পাড়ি দিয়াছিলেন। ফেরাউনের তখন একমাত্র লক্ষ্য বনিইস্রায়েলগণকে আক্রমণ ও ধৃত করা, জোয়ার বা ভাটার প্রতি লক্ষ্য ছিল না। হয়ত শাহী উমরতবাসী ফেরাউনের ঐ বিষয় অভিজ্ঞতাও ছিল না। তিনি ভাটার প্রথম বা শেষ অবস্থার প্রতি লক্ষ্য না করিয়াই চলিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। বনিইস্রায়েলগণ যখন এপারে আসিয়াছিলেন, ফেরাউন তখন মধ্যহ্রদে রেমেসিস সদলে ডুবিয়া মরিলেন (খৃঃ পৃঃ ১২৮৫) ।
হজরত মুসার জলাশয় পার হইবার বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতবাদের মধ্যে বাস্তব ও গ্রহণযোগ্য কোনটি?
৩।
হজরত মুসা সীনয় পর্বতে কি দেখিয়াছিলেন?
শোনা যায়- হজরত মূসা মিশর হইতে সদলে বাহির হইবার পর তৃতীয় মাসের প্রথম দিনে সীনয় পর্বতের পাদদেশে উপস্থিত হন এবং তৃতীয় দিন ভোরে ঐ পর্বতের উপরে আল্লাহকে দেখিতে ও তাঁহার বাক্য শুনিতে পান। এই সম্বন্ধে তৌরিতের লিখিত বিবরণটি এইরূপ­ “পরে তৃতীয় দিন প্রভাত হইলে মেঘ গর্জন ও বিদ্যুৎ এবং পর্বতের উপরে নিবিড় মেঘ হইল; আর অতিশয় উচ্চ রবে তুরীধ্বনি হইতে লাগিল। পরে মোশি ঈশ্বরের সঙ্গে সাক্ষাৎ কবিরার জন্য লোকদিগকে শিবির হইতে বাহির করিলেন আর তাহারা পর্বতের তলে দণ্ডায়মান হইল। তখন সমস্ত সীনয় পর্বত ধূমময় ছিল। কেননা সদা প্রভু অগ্নিসহ তাহার উপর নামিয়া আসিলেন আর ভাটির ধূমের ন্যায় তাহা হইতে ধূম উঠিতে লাগিল এবং সমস্ত পর্বত অতিশয় কাঁপিতে লাগিল। আর তুরীর শব্দ ক্রমশ অতিশয় বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। তখন মোশি কথা কহিলেন এবং ঈশ্বর বাণী দ্বারা তাঁহাকে উত্তর দিলেন (২৯)।”
উক্ত বিবরণে দেখা যায় যে, ঐদিন ভোরে সীনয় পর্বতে (কোহেতূরে) মেঘ গর্জন, বিদ্যুৎ চমক ও তুরীধ্বনি (শিলা বৃষ্টির সময়ে মেঘস্থিত অবিরাম গর্জন) হইতেছিল এবং মুহুর্মুহু বাক্য শ্রবণ ও তাঁহার নূর (আলো) দর্শন করিয়াছিলেন, এই বলিয়া যে একটি আখ্যান আছে, উহা মেঘ-গর্জন ও বিদুøতালোকে হইতে পারে না কি?
প্রখ্যাত পুরাতত্ত্ববিদ এরিখফল দানিকেনের মতে ইহুদীদের আরাধ্য দেবতা ‘যিহোবা’ নিরাকায় ঈশ্বর নহেন, তিনি ব্যক্তিসত্তার অধিকারী ভিন্ন গ্রহবাসী মানুষ। যিহোবার তূরপর্বতে অবতরণের আখ্যানটি আসলে ভিন্ন গ্রহবাসী কোন বৈমানিকের বিমান যোগে পৃথিবীতে আগমন ও তূরপর্বতে অবতরণ।
মানবরূপী পাহাড়বাসী ‘যিহোবা’ আল্লাহ্‌তা’লা বলিয়া স্বীকৃতি পান কিরূপে? নতুবা হজরত মূসা (আঃ)-কে ‘কলিমুল্লাহ্‌’ বলা হয় কেন? [এই পঙতিটি রচনাবলীতে নেই]
৪। হযতর সোলায়মানের হেকমত না কেয়ামত?
শোনা যায় যে, হজরত সোলায়মান একাধারে বাদশাহ্‌ এবং পয়গম্বর ছিলেন। পয়গম্বর হিসাবে তাঁর প্রসিদ্ধি বোধ হয় খুব বেশী ছিল না। কিন্তু ‘বাদশাহ’ বিশাল সাম্রাজ্য, বিভিন্ন জাতির উপর একাধিপত্য ও তাঁর বিপুল ঐশ্বর্যের বিষয় পর্যালোচনা করিলে মনে হয় যে, তিনি সেই যুগের একজন প্রথম শ্রেণীর সম্রাট ছিলেন। সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল তাঁর সুতীক্ষ্ণ বুদ্ধি।
কোন কোন ধর্ম প্রচারক বলিয়া থাকেন যে, হজরত সোলায়মান-পশু-পাখী, কীট-পতঙ্গ এমনকি পিপীলিকারও ভাষা জানিতেন এবং উহারা তাঁর আদেশ মানিয়া চলিত; জ্বীন-পরী, দেও-দানব এমনকি পবনও। অধিকন্তু তিনি হাওয়ায় উড়িতে পারিতেন।
হজরত সোলায়মান ইতর প্রাণীর ভাষা জানিতেন কি না এবং জ্বীন-পরীরা তাঁর আজ্ঞাবহ ছিল কি না, তাহা
প্রশ্ন নহে। এখানে প্রশ্ন হইল এই যে, তিনি যে হাওয়ায় উড়িতে পারিতেন বলিয়া দাবী করা হয়, তাহা কি তাঁর হেকমত, না কেরামত। অর্থাৎ তিনি কি কোন কৌশলে উড়িতেন, না আল্লাহ্‌র কৃপায় উড়িতেন? যদি তিনি আল্লাহ্‌র দয়ায়ই উড়িয়া থাকেন, তাহা হইলে লক্ষাধিক পয়গম্বরের মধ্যে অপর কেউ উড়িতে পারিলেন না কেন? তাঁহাদের প্রতি কি আল্লাহ্‌র ঐরূপ অনুগ্রহ ছিল না?
লঙ্কেশ্বর রাবণের পুত্র মেঘনাদ (ইন্দ্রজিৎ)-এর শূন্যে উড়িবারও একটি প্রবাদ আছে। তিনি নাকি ছিলেন অসভ্য রাক্ষস জাতি এবং নানা দেব-দেবীর উপাসক। তিনি যে কোন কৌশলে উড়িতেন তাহা বলা যায় না এবং তিনি যে আল্লাহ্‌র রহমতে উড়িতেন, তাহাও কল্পনা করা যায় না। তবে তাঁর বিমানে (রথে) আরোহণ সম্ভব হইল কিরূপে? উহা কি রামায়ণের কবি বাল্মিকীর কল্পনা মাত্র? তাহাই যদি হয়, তবে সোলায়মানের বেলায় ঐরূপ হইত পারে কি না?
ভগবানের দয়া অথবা জ্ঞানের ক্রিয়া, যাহাই হউক, হজরত সোলায়মানের বিমানে আরোহণ যে সত্য, তার প্রমাণ কি? তিনি কি শুধু স্বদেশেই উড়িতেন?
আধুনিক বিজ্ঞানীগণ বিদ্যুৎ ও পেট্রোল খরচ এবং নানারূপ দুর্ঘটনার (Accident) ভয়কে উপেক্ষা করিয়া সারে জাহান সফর করেন। হজরত সোলায়মান কি বিনা খরচে বিঘ্নহীন বিমানে আরোহণ করিয়াও দেশান্তর গমন করেন নাই? যদি করিয়াই থাকেন তাহা হইলে তৎকালের কোন সভ্য দেশের ইতিহাসের উহা লিপিবদ্ধ নাই কেন? চীনদেশ না হয় একটু দূরেই ছিল, গ্রীক বা মিশর দেশে কি তিনি কখনও যান নাই? অথবা সে দেশের ঐ যুগের কোন ঐতিহাসিক ঘটনা বর্তমানে জানা যায় না কি?
হজরত সোলায়মান সিংহাসন লাভ করেন খৃঃ পূঃ ৯৭১ সালে (৩০) এবং মহাবীর আলেকজান্ডার ভারতে আসেন খৃঃ পূঃ ৩৩০, সময়ের ব্যবধান মাত্র ৬৪১ বৎসর। ভারতবর্ষ হইতে গ্রীসের দূরত্ব, হজরত সোলায়মানের বাসস্থান জেরুজালেমের দূরত্ব হইতে প্রায় ৭/৮ শত মাইল অধিক। তথাপি গ্রীকাধিপতি আলেকজান্ডার হাঁটিয়াই ভারতে আসিয়াছিলেন। আর হজরত সোলায়মান কি উড়িয়াও এ দেশে আসিতে পারিলেন না? যদি আসিয়াই থাকিতেন, তাহা হইলে- আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের ঘটনা যখন এদেশের ঐতিহাসিকগণ ভুলিতে পারিলেন না তখন হজরত সোলায়মানের ভারতে আগমনের বিষয় ভুলিলেন কিরূপে?
৫। যীশু খ্রীষ্টের পিতা কে?
‘পিতা’ এই শব্দটিতে সাধারণত আমরা জন্মদাতাকেই বুঝিয়া থাকি, অর্থাৎ সন্তান যাহার ঔরসজাত তাহাকেই। কিন্তু উহার কতিপয় ভাবার্থও আছে। যেমন- শাস্ত্রীয় মতে পিতা পাঁচজন। যথা- অন্নদাতা, ভয়দাতা, শ্বশুর, জন্মদাতা ও উপনেতা। কেহ কেহ আবার জ্ঞানদাতা অর্থাৎ শিক্ষা-গুরু এবং জ্যেষ্ঠভ্রাতাকেও পিতৃতুল্য বলিয়া মনে করেন। এ মতে পিতা সাতজন (৩১) ।
শোনা যায় যে, যীশুখ্রীষ্ট (হজরত ঈসা আঃ) অবিবাহিতা মরিয়মের গর্ভে জন্মলাভ করিয়াছিলেন। তাঁহার কেহ পিতা নাই, তিনি ঈশ্বরের পুত্র? কিন্তু তিনি কি ভগবানের ঔরসে ভগবতীর গর্ভজাত গণেশের ন্যায় পুত্র? সেমিটিক জাতির প্রত্যেকেই ইহাতে বলিবেন “না”। তবে তিনি ঈশ্বরের কোন শ্রেণীর পুত্র? “সৃষ্টিকর্তা” বলিয়া যদি পরমেশ্বরকে “পিতা” বলা যায়, তবে তিনি তাঁর সৃষ্ট সকল জীবেরই পিতা, যীশুর একার নয়। মহাপ্রভুর দয়া-মায়া, ভালবাসা ইত্যাদি এমন কোন বিষয় আছে, যাহা অন্য আম্বিয়াদের প্রতি ছিল না, যদ্বারা যীশু একাই মহাপ্রভুর পুত্রত্ব দাবী করিতে পারেন? মহাপ্রভু নাকি হজরত মূসাকে সাক্ষাৎদান ও তাঁর সাথে বাক্যালাপ করিয়াছিলেন, হজরত সোলায়মানকে হাওয়ায় উড়াইয়াছিলেন এবং হজরত মোহাম্মদ (সঃ)-কে মে’রাজে নিয়া তাহার সহিত নানাবিধ কথোপকথন করিয়াছিলেন। ইহারা কেহই মহাপ্রভুর পুত্র নহেন কেন? পক্ষান্তরে- তৎকালীন ইহুদীগণ রাষ্ট্র ও ধর্মদ্রোহিতার অপরাধে যীশুখ্রীষ্টকে ক্রুশে আরোহণ করাইয়া তাঁর হস্ত ও পদে পেরেক বিদ্ধ করিয়া যখন অন্যায় ও নিমর্মভাবে হত্যা করিল তখন তাঁর পিতা ন্যায়বান পুত্রের পক্ষে একটি কথাও বলিলেন না বা তাঁহাকে উদ্ধারের কোন ব্যবস্থা করিলেন না। কোন পিতা তার পুত্রহত্যা দর্শনে নীরব ও নির্বিকার থাকিতে পারেন, এরূপ দৃষ্টান্ত কোথায়ও আছে কি?
হয়ত কেহ বলিতে পারেন যে, খোদাতায়ালা ফেরেস্তার মারফতে বিবি মরিয়মের প্রতি তাঁর ‘বাণী’ পাঠাইয়াছিলেন এবং সেই বাণীর বদৌলতেই তাঁর গর্ভ হইয়াছিল এবং তাহাতে যীশু জন্মিয়াছিলেন। তাই তিনি খোদার পুত্র বলিয়া আখ্যায়িত। তাই যদি হয়, তবে- হজরত জাকারিয়া নবীর স্ত্রী ইলীশাবেত চিরবন্ধ্যা হেতু কোন সন্তানাদি না হওয়ার বৃদ্ধা বয়সে ফেরেস্তার মারফতে খোদাতা’লার ‘বাণী’ প্রাপ্তে তাঁর নাকি গর্ভ হইয়াছিল এবং সেই গর্ভে হজরত ইয়াহিয়া নবী জন্মলাভ করিয়াছিলেন। তিনি খোদার পুত্র নহেন কেন?
বিজ্ঞানীদের মতে- পুরুষের প্রধান জননেন্দ্রিয় শুক্রাশয় (Testes)। উহার ভিতর এক শ্রেণীর কোষ (Cell) আছে, তাহাকে বলা হয় শুক্রকীট। সেগুলি দেখিতে ব্যাঙাচির মত। কিন্তু এত ছোট যে, অনুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া তাহাদের লেখা যায় না। ইহারা শুক্রাশয়ের ভিতরে যথেচ্ছ সাঁতরাইয়া বেড়ায়।
শুক্রাশয়ের সাথে দুইটি সরু নল দিয়া মূত্র নলির যোগ আছে। সঙ্গমের সময় শুক্রকীটগুলি ঐ নল বাহিয়া মূত্র নলির ভিতর দিয়া স্ত্রী অঙ্গে প্রবেশ করিতে পারে।
মেয়েদের প্রধান জননেন্দ্রিয় ডিম্বাধার (Overiss)। ইহা তলপেটের ভিতর ছোট দুইটি গ্ল্যান্ড। ইহার সহিত সরু নলের দ্বারা জরায়ুর যোগ আছে। ডিম্বাধারের ভিতর ডিম্বকোষ প্রস্তুত হয়। ডিম্বাধারের ভিতর ডিম্বকোষ প্রস্তুত হইয়া পূর্ণতালাভ করিলেই উহা নলের ভিতর দিয়া জরায়ুতে নামিয়া আসে।
স্ত্রী-পুরুষের মিলনের সময়ে- পুরুষের বীর্যের সহিত শুক্রকীট স্ত্রী-অঙ্গ দিয়া প্রবেশ করিয়া জরায়ুর ভিতর ঢোকে। সেখানে স্ত্রীর ডিম্বকোষ তৈয়ারী থাকে শুক্রকীটের আগমনের অপেক্ষায়। শুক্রকীটগুলি জরায়ুতে প্রবেশ করিয়াই লেজ নাড়িয়া (ব্যাঙাচির মত ইহাদের লেজ থাকে) সাঁতার কাটিয়া ডিম্বকোষের দিকে ছুটিয়া আসে। উহাদের মধ্যে মাত্র একটিই ডিম্বকোষের ভিতর ঢুকিতে পারে। কেননা একটি ঢোকা মাত্রই ডিম্বকোষের বাহিরের পর্দায় এমন পরিবর্তন ঘটে যে, অন্য কোন শুক্রকীট আর ঢুকিতে পারে না। ডিম্বকোষের মধ্যে ঢুকিবার সময় শুক্রকীটের লেজটি খসিয়া বাহিরে থাকিয়া যায়।
মানুষের বেলায় সচরাচর প্রতি মাসে নির্দিষ্ট দিনে একটি করিয়া ডিম্বকোষে স্ত্রীলোকের ডিম্বাধারে প্রস্তুত হইয়া থাকে। কোন জন্তুর তিন মাষ, কোন জন্তুর ছয় মাস, কাহারো বা বৎসরান্তে একবার ডিম্বকোষ জন্মে। যদি সেই সময় শুক্রকীটের সঙ্গে উহার মিলন না হয়, তবে দুই চারদিনের মধ্যেই ডিম্বকোষটি শুকাইয়া মরিয়া যায়। আবার যথা সময়ে (ঋতুতে) আর একটি প্রস্তুত হয়।
শুক্রকীট ও ডিম্বকোষের মিলন হইলে- মিলনের পরমুহূর্ত হইতে ডিম্বকোষের মধ্যে আশ্চর্য পরিবর্তন ঘটিতে থাকে। ডিম্বকোষের মধ্যে ঢুকিবার পর শুক্রকীটের কোষকেন্দ্র আরও বড় হইতে থাকে এবং খানিকটা বড় হইয়া ডিম্বকোষের কোষকেন্দ্রের সঙ্গে একেবারে মিশিয়া যায়। নানা বৈচিত্র্যময় পরিবর্তনের পর আরম্ভ হয় বিভাজন। একটা হইতে দুইটা, হইতে চারিটা এবং তাহা হইতে আটটা, এইভাবে ক্রমাগত বৃদ্ধি পাইয়া তিন সপ্তাহের মধ্যে ডিম্বকোষ সমূহ সংখ্যায় বাড়িয়া গিয়া আয়তনে এত বড় হয় যে, তখন তাহাকে ‘ভ্রূণ’ বলিয়া চেনা যায়। মানুষের বেলায় শরীরের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে ফুটিয়া উঠে। কিন্তু তখনও উহা ১/৫ ইঞ্চির বেশী বড় হয় না। দুই মাস পরে পুরা এক ইঞ্চি হয় এবং তখন হইতে উহাকে ‘মানুষের ভ্রূণ’ বলিয়া চেনা যায়। পুরাপুরি শিশুর মত হইতে সময় লাগে আরও সাত মাস, নুন্যাধিক নয় মাস পর জরায়ু মাতৃজঠর ত্যাগ করিয়া ভূমিষ্ঠ হয় ‘মানব শিশু’।
নারী ও পুরুষের মিলনের অর্থই হইল- শুক্রকীট ও ডিম্বকোষের মিলন সাধন। নারী ও পুরুষের প্রতিক্রিয়া ব্যতীত শুক্র ও ডিম্বকোষের মিলন সম্ভব হইতে পারে। কোন পুরুষের বীর্য সংগ্রহ পূর্বক তাহা যথা সময়ে কোন কৌশলে নারীর জরায়ুর মধ্যে প্রবেশ করাইয়া শুক্রকীট ও ডিম্বকোষের মিলন ঘটাইতে পারা যায় এবং তাহাতে সন্তানোৎপত্তি হইতে পারে। কিন্তু কোনও না কোন প্রকারের যৌনমিলন ব্যতীত সন্তানোৎপত্তি হওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব।
সমাজ বিজ্ঞানীগণ বলেন যে, সভ্যতা প্রাপ্তির পূর্বে মানুষ ও পশু-পাখীর আহার-বিহার, চাল-চলন ইত্যাদিতে বিশেষ পার্থক্য ছিল না, এমনকি যৌন ব্যাপারেও না। তখন তাহাদের যৌন মিলন ছিল পশু-পাখীদের মতই যথেচ্ছ। কেননা তাহাদের মধ্যে বিবাহ প্রথা ছিল না। সেকালের অসভ্য মানবসমাজে কাহারো জনক নির্ণয় করা ছিল প্রায় দুঃসাধ্য। মানব সভ্যতার ক্রমবৃদ্ধির একটি মস্ত বড় ধাপ হইল বিবাহ প্রথার প্রবর্তন। ইহাতে মানুষের জনক নির্ণয় সাধ্যায়ত্ত হইয়াছে বটে, কিন্তু পূর্ণায়ত্ত হইয়াছে কি? এ কথা বলিলে হয়ত অসত্য বলা হইবে না যে, সামাজিক তথা আনুষ্ঠানিক পরিণয়াবদ্ধ স্বামী বর্তমান থাকিতে উপস্বামীকে ধারণ সভ্য মানব সমাজে বিরল নয়। এইরূপ ক্ষেত্রে কোন সন্তান জন্মিলে প্রায় সর্বত্র বিবাহিত স্বামীকেই বলা হয় শিশুর পিতা এবং মনে করা হয় “জনক” (স্মরণ রাখা উচিত যে, “পিতা ও জনক” এক কথা নয়। “পিতা” = পালন কর্তা এবং “জনক” = জন্মদাতা)। এহেন অবস্থায় শিশুর জনক চিরকাল অপ্রকাশ্যই থাকিয়া যায়। কিন্তু জাতকের দৈহিক অবয়ব, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, রুচি, ধর্মাধর্ম বা বিষয় বিশেষের প্রতি অনুরাগ-বিরাগ ইত্যাদি বিষয় সমূহে জনকের সহিত বহু সাদৃশ্য থাকে। কিন্তু উহা কেহ তলাইয়া দেখে না বা সকল ক্ষেত্রে দেখা সম্ভব নয়।
যীশুখ্রীষ্টের আবির্ভাবের সময় সখরিয়া (হজরত জাকারিয়া আঃ) নামক জনৈক ব্যক্তি ছিলেন ইহুদীদের ধর্মযাজক ও জেরুজালেম মন্দিরের সোবাইত বা পুরোহিত। শোনা যায় যে, যীশুর মাতা মরিয়মকে তাঁর পিতা এমরান মরিয়মের তিন বৎসর সময় জেরুজালেম মন্দিরের সেবা কাজের জন্য প্রেরণ করেন এবং সেখানে তিনি সখরিয়া কর্তৃক পালিতা হন (৩২)। সখরিয়ার কোন সন্তান ছিল না, তাঁর ঘরে ছিলেন অতিবৃদ্ধ বন্ধ্যা স্ত্রী ইলীশাবেত (৩৩)।
সখরিয়া তাঁর ১২০ বৎসর বয়সের সময় ফেরেস্তার মারফতে পুত্রবর প্রাপ্ত হন ও তাহাতে ইলীশাবেত গর্ভবতী হন এবং ইহার ছয় মাস পরে ফেরেস্তার মারফতে পুত্রবর প্রাপ্ত হইয়া ১৬ বৎসর বয়সে মরিয়মও গর্ভবতী হন।
অবিবাহিতা মরিয়ম সখরিয়ার আশ্রমে থাকিয়া গর্ভবতী হইলে লোক লজ্জার ভয়ে ধর্মমন্দির ত্যাগ করিয়া নিজ জ্ঞাতি ভ্রাতা যোসেপের সঙ্গে জেরুজালেমের নিকটবর্তী বৈৎলেহম (বয়তুলহাম) নামক স্থানে গিয়া অবস্থান করেন এবং ঐ স্থানে যথা সময়ে এক খর্জুর বৃক্ষের ছায়ায় যীশুখ্রীষ্ট ভূমিষ্ট হন।
অবিবাহিতা মরিয়ম এক পুত্রসন্তান প্রসব করিয়াছেন ইহা জানিতে পারিয়া (মরিয়ম ও সখরিয়ার
স্বজাতীয়) ইহুদীগণ তাঁহাকে তীব্র ভৎর্সনা করিতে থাকে এবং তাহারা মরিয়মের পালন পিতা সুবৃদ্ধ সখরিয়াকে ধৃত করিবার চেষ্টা করে এবং সখরিয়া এক বৃক্ষ কোটরে লুকাইয়া থাকেন। কিন্তু ইহুদীগণ খোঁজ পাইয়া করাত দ্বারা ঐ বৃক্ষটি ছেদন করার সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধ সখরিয়া দ্বিখণ্ডিত হইয়া প্রাণ ত্যাগ করেন (৩৪)। মরিয়ম সদ্যজাত শিশুটিকে ক্রোড়ে লইয়া যোসেফের সঙ্গে রাত্রিযোগে স্বদেশ ত্যাগ করিয়া মিশরে চলিয়া যান এবং সেখান হইতে গালীর প্রদেশের নাসরৎ নগরে যাইয়া কালাতিপাত করেন (৩৫)।
তৎকালে সে দেশের রাজার নাম ছিল হেরোদ, তিনি জাতিতে ছিলেন ইহুদী। তাই রাজ্য শাসিত হইত তৌরিতের বিধান মতে। তৌরিতের বিধান মতে- “ব্যভিচার” ও “নরহত্যা” এই উভয়বিধ অপরাধেরই একমাত্র শাস্তি “প্রাণদণ্ড” (৩৬)। এখানে ব্যভিচারের অপরাধে সখরিয়ার প্রাণদণ্ডের বিষয় জানা যায় বটে কিন্তু সখরিয়াকে বধ করার অপরাধে কোন ইহুদীর প্রাণদণ্ডের বিষয় জানা যায় না। ইহাতে মনে আসিতে পারে যে, সখরিয়া নিরপরাধ হইলে, তাঁহাকে বধ করার অপরাধে নিশ্চয় ঘাতক ইহুদীর প্রাণদণ্ড হইত। কেননা সখরিয়া ছিলেন তৎকালীন ইহুদী সমাজের একজন উচ্চস্তরের ব্যক্তিত্বশালী ও মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি।
এতদ্বিষয়ে পর্যালোচনা করিলে মনে স্বতঃই প্রশ্ন জাগে যে, যীশুখ্রীষ্টের জনক- মহাপ্রভু, না সখরিয়া?
(যীশুর প্রসঙ্গে হিন্দু শাস্ত্রে লিখিত মহর্ষি পরাশরের ঔরসে অবিবাহিতা মৎস্যগন্ধার গর্ভজাত মহামনীষী ব্যাসের কাহিনী অনুধাবন যোগ্য। তবে উহাতে পরাশরের বিকল্পে স্বর্গদূতের পরিকল্পনা নাই।)
৬। জ্বীন জাতি কোথায়?
শোনা যায় যে, এই জগতে জ্বীন নামক এক জাতীয় জীব আছে। তাহাদের নাকি মানুষের মত জন্ম, মৃত্যু, পাপ-পুণ্য এবং পরকালে স্বর্গ বা নরক বাসের বিধান আছে। কোন জীব যদি পাপ-পুণ্যের অধিকারী হয় তবে সে জাতি যে জ্ঞানবান, তাহা অনুমান করা অসঙ্গত নহে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, অদ্যাবধি পৃথিবীতে জ্বীন জাতির অস্তিত্বের কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নাই। ক্যাপ্টেন কুক, ড্রেক, ম্যাগিলন প্রভৃতি ভূ-পর্যটকগণের পর্যটনের ফলে পৃথিবীতে অনাবিষ্কৃত দেশ “নাই” বলিলেই চলে। কিন্তু জ্বীন জাতির অস্তিত্বের সন্ধান মিলিল কৈ? তবে কি তাহারা গ্রহ-উপগ্রহ বা নক্ষত্রলোকে বাস করে?
দশটি গ্রহ এবং তাহাদের গোটা ত্রিশেক উপগ্রহ আছে। খুব শক্তিশালী দূরবীক্ষণের সাহায্যেও ঐ সকল গ্রহ
বা উপগ্রহে কোন রকম জীবের সন্ধান পাওয়া যায় নাই। আর যতদূর জানা গিয়াছে তাহাতে বুঝা যায় যে, নক্ষত্রগুলি সবই অগ্নিময় এবং উহাদের তাপমাত্রা কোনটিরই দুই হাজার ডিগ্রীর কম নয়, কোন কোনটির তেইশ হাজার ডিগ্রীর উপর। ওখানে কোনরূপ জীব বাস করা দূরের কথা, জন্মিতেই পারে না। যদি বা পারে, তাহা হইলে বাসিন্দাদের দেহও হওয়া উচিত অগ্নিময় এবং কেহ কেহ বলেনও তাহাই। বলা হয় যে, জ্বীনগণ আগুনের তৈয়ারী। তাহাই যদি হয়, তবে তাহাদের পরকালে আবার দোযখ বা অগ্নিবাস কিরূপ? পক্ষান্তরে-তাহারা যদি এই পৃথিবীতেই বাস করে, তবে তাহারা কোন (অদৃশ্য) বস্তুর তৈয়ারী?
ইহুদী শাস্ত্রে “শেদিম” নামে একশ্রেণীর কাল্পনিক জীবের বর্ণনা পাওয়া যায়। জ্বীনগণ তাহাদের প্রেতমূর্তি নয় কি?
৭। সূর্য বিহীন দিন কিরূপ?
দিন, রাত, মাস ও বৎসরের নিয়ামক সূর্য এবং গতিশীল পৃথিবী। ইহার কোনটিকে বাদ দিয়া আমরা দিবা, রাত্রি, মাস ও বৎসর কল্পনা করিতে পারি না। কেননা সূর্য থাকিয়াও পৃথিবী বিশেষত তার গতি না থাকিলে পৃথিবীর একাংশে থাকিত চিরকাল দিবা এবং অপর অংশে থাকিত রাত্রি। সেই অফুরন্ত দিন বা রাত্রিতে মাস বা বৎসর চিনিবার কোন উপায় থাকিত না। পক্ষান্তরে সূর্য না থাকিয়া শুধু গতিশীল পৃথিবীটা থাকিলে, সে চিরকাল অন্ধকারেই ঘুরিয়া মরিত, দিন-রাত-মাস-বৎসর কিছুই হইত না।
শোনা যায় যে এস্রাফিল ফেরেস্তা যখন আল্লাহ্‌র আদেশে সিঙ্গা ফুঁকিবে, তখন মহাপ্রলয় হইবে। তখন পৃথিবী এবং চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্রাদি বিলয় হইবে। একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত আর কিছুই থাকিবে না। এমন কি যে এস্রাফিল সিঙ্গা ফুঁকিবে সেও না। এহেন অবস্থায় চল্লিশ দিন (মতান্তরে ৪০ বৎসর) পরে আল্লাহ এস্রাফিলকে পুনঃ সৃষ্টি করিবেন এবং আল্লাহর হুকুমে সে পুনরায় সিঙ্গা ফুঁকিবে ফলে পুনরায় জীব ও জগৎ সৃষ্টি হইবে।
মহাপ্রলয়ে (কেয়ামতের) পরে সূর্য বা তদনুরূপ আলোবিকিরণকারী কোন পদার্থই থাকিবে না। এইরূপ অবস্থার পরে এবং পুনঃ সৃষ্টির পূর্বে “চল্লিশ দিন বা বৎসর” হইবে কিরূপে? যদিই বা হয়, তবে ঐ দিনগুলির সহিত রাত্রিও থাকিবে কি? থাকিলে, সূর্য ভিন্ন সেই “দিন” ও “রাত্রি” কিরূপে হইবে? আর দিনের সঙ্গে রাত্রি না থাকিলে, অবিচ্ছিন্ন আলোকিত “দিন”-এর সংখ্যা “চল্লিশ” হইবে কিরূপে?
৮। ফরায়েজে “আউল” কেন?
মৃত ব্যক্তির ত্যাজ্য সম্পত্তি তার ওয়ারিশগণের মধ্যে বণ্টনব্যবস্থাকে বলা হয় “ফরায়েজ নীতি”। ইহা পবিত্র কোরানের বিধান। মুসলিম জগতে এই বিধানটি যেরূপ দৃঢ়ভাবে প্রতিপালিত হইতেছে, সেরূপ অন্য কোনটি নহে। এমনকি পবিত্র নামাযের বিধানও নহে। ইহার কারণ বোধ হয় এই যে, ফরায়েজ বিধানের সঙ্গে জাগতিক স্বার্থ জড়িত আছে। কিন্তু পবিত্র নামাজের সাথে উহা নাই। থাকিলে বোধ হয় যে নামাজীর সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পাইত। সে যাহা হউক, এই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধানটিতেও একটি “আউল” দেখা যায়। এই কথাটির ধাতুগত অর্থ যাহাই হউক, এতদ্দেশে উহাতে মনে করা হয়- “অগোছাল” বা “বিশৃঙ্খল”।
ফরায়েজ বিধানের মধ্যে কোন কোন ক্ষেত্রে এমনও দেখা যায় যে, মৃতের ত্যাজ্য সম্পত্তি তাহার ওয়ারিশগণের মধ্যে নির্ধারিত অংশ মোতাবেক বণ্টন করিলে কেহ পায় এবং কেহ পায় না। উদাহরণ স্বরূপ দেখানো যায় যে, যদি কোন মৃত ব্যক্তির- মা, বাবা, দুই মেয়ে ও স্ত্রী থাকে, তবে- মা ১/৬, বাবা ১/৬, দুই মেয়ে ২/৩ এবং স্ত্রী ১/৮ অংশ পাইবে। কিন্তু ইহা দিলে স্ত্রী কিছুই পায় না। অথচ স্ত্রীকে দিতে গেলে সে পাইবে ১/৮ অংশ। এ ক্ষেত্রে মোট সম্পত্তি “১” এর স্থলে ওয়ারিশগণের অংশে সম্পত্তি হয় ১১/৮। অর্থাৎ ষোল আনার স্থলে হয় আঠার আনা। সমস্যাটি গুরুতর বটে। মুসলিম জগতে উক্ত সমস্যাটি গুরুতর বটে।
মুসলিম জগতে উক্ত সমস্যাটি বহুদিন যাবত অমীমাংসিতই ছিল। অতঃপর সমাধান করিলেন হজরত আলী (রাঃ) (৪০)। তিনি যে নিয়মের দ্বারা উহার সমাধান করিয়ছিলেন, তাহার নাম “আউল”।
হজরত আলী (রাঃ)-এর প্রবর্তিত “আউল” বিধানটি এইরূপঃ মৃত-অনামা ব্যক্তি (ফরায়েজ মতে)।
মা বাবা মেয়ে (২) স্ত্রী
১/৬ ১/৬ ২/৩ ১/৮
প্রথমত, উক্ত রাশি চারিটিকে সমান হর বিশিষ্ট করিতে হইবে এবং তাহা করিলে উহা হইবে­
৪/২৪ , ৪/২৪ , ১৬/২৪ ও ৩/২৪ ; ইহার যোগফল হইবে ২৭/২৪।অতএব দেখা যাইতেছে যে, যেখানে মূল সংখ্যা (হর) ছিল ২৪, সেখানে অংশ বাড়িয়া (লব) হইয়া যাইতেছে ২৭। সুতরাং ‘২৭’ কেই মূল সংখ্যা (হর) ধরিয়া অংশ দিতে হইবে। অর্থাৎ দিতে হইবে -
৪/২৭ + ৪/২৭ + ১৬/২৭ + ৩/২৭ = ২৭/২৭ = ১।
পবিত্র কোরানে বর্ণিত আলোচ্য ফরায়েজ বিধানের সমস্যাটি সমাধান করিলেন হজরত আলী (রাঃ) তাঁর গাণিতিক জ্ঞানের দ্বারা এবং মুসলিম জগতে আজও প্রচলিত উহাই। এ ক্ষেত্রে স্বভাবতই মনে উদয় হয় যে, তবে কি আল্লাহ গণিতজ্ঞ নহেন? হইলে পবিত্র কোরানের উক্ত বিধানটি ত্রুটিপূর্ণ কেন?
আল্লাহ পবিত্র কোরানে পরিষ্কার ভাষায় বলিয়াছেন যে, যাহারা আল্লাহর হুকুম পালন করিয়া তাঁর ফরায়েজ আইন মান্য করিবে, তাহারা বেহেস্তী হইবে এবং অমান্যকারীরা হইবে দোজখী। যথা- “ইহা অর্থাৎ এই ফরায়েজ আইন ও নির্ধারিত অংশ আল্লাহর সীমা রেখা এবং আল্লাহর নির্ধারিত অংশসমূহ। যাহারা আল্লাহর আদেশ এবং তাঁহার রছুলের আদেশ মান্য করিবে, তাহাদিগকে আল্লাহ্‌ বেহেস্তে স্থানদান করিবেন...(৩৮)।
পুনশ্চ- “যে কেহ আল্লাহ্‌র আদেশ, আল্লাহ্‌র আইনে নির্ধারিত অংশ ও তাঁহার নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করিবে, তাহাকে আল্লাহ দোজখবাসী করিবেন, তথায় সে চিরকাল থাকিবে এবং তথায় তাহার ভীষণ অপমানজনক শাস্তিভোগ করিতে হইবে।” (৩৯)
পবিত্র কোরানে বর্ণিত ফরায়েজ বিধানের মধ্যে ক্ষেত্র বিশেষে কতগুলি (হজরত আলীর প্রবর্তিত) “আউল” নীতির পর্যায়ে পড়ে এবং উহাতে কোরান মানিয়া বণ্টন চলে না, আবার “আউল” মানিলে হইতে হয় দোজখী। উপায় কি?
ফরায়েজ বিধানের একশ্রেণীর ওয়ারিশকে বলা হয় “আছাবা”। অর্থাৎ অবশিষ্ট ভাগী। মৃতের ওয়ারিশগণের নির্ধারিত অংশ দেওয়ার পর যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে, তবে তাহা আছাবাগণ পাইয়া থাকে। আছাবাদের মধ্যে অংশ বণ্টনের একটি বিশেষ নিয়ম এই যে, নিকটবর্তী ওয়ারিশ একজনও থাকিলে দূরবর্তী কেহ অংশ পায়না এবং এই নিয়মের ফলেই পুত্র না থাকিলে পৌত্র (নাতি) কিছুই পায় না। কিন্তু অধুনা রাষ্ট্রীয় বিচারগতিগণ পুত্র না থাকিলেও পৌত্রকে অংশ দিতে শুরু করিয়াছেন। যে বিচারপতিগণ উহা করিতেছেন, তাঁহারা পরকালে যাইবেন কোথায়?
৯। স্ত্রী ত্যাগ ও হিলা প্রথার তাৎপর্য কি?
কেহ কেহ স্ত্রীকে অর্ধাঙ্গিনী বলিয়া থাকেন। এ কথাটির বিশেষ তাৎপর্য আছে। অর্ধ-অঙ্গিনী বা সিঁকি অঙ্গিনী না হইলেও আদি পুরুষ হজরত আদমের বাম পঞ্জরের অস্থি হইতেই নাকি প্রথমা নারী হাওয়া বিবি সৃষ্টি হইয়াছিলেন। তাই বিবি হওয়াকে আদমের অঙ্গজ হিসাবে “অঙ্গিনী” বলা খুবই সমীচীন। ইহা ছাড়া সংসার জীবনে নারীরা পুরুষদের একাংশ হিসাবেই বিরাজিতা।
মানুষের হস্তপদাদি কোন অঙ্গ রুগ্ন হইলে উহার প্রতিকারের জন্য চিকিৎসা করান হয়। রোগ দুরারোগ্য হইলে ঐ রুগ্নাঙ্গ লইয়াই জীবন কাটাইতে হয়। রুগ্নাঙ্গ লইয়া জীবন কাটাইতে প্রাণহানীর আশঙ্কা না থাকিলে কেহ রুগ্নাঙ্গ ত্যাগ করে না। স্ত্রী যদি স্বামীর অঙ্গই হয়, তবে দুষিতা বলিয়া তাহাকে ত্যাগ করা হয় কেন? কোন রকম কায়-ক্লেশে জীবন যাপন করা যায় না কি?
জবাব হইতে পারে যে, সখের বশবর্তী হইয়া কেহ কখনও স্ত্রী ত্যাগ করে না। সাংসারিক বিশৃঙ্খলা ও মানসিক অশান্তি যখন চরমে পৌঁছে তখনই কেহ কেহ স্ত্রী ত্যাগ করিতে বাধ্য হয়। কথাটি কতকাংশে সত্য, কিন্তু যাহারা একাধিক স্ত্রী ত্যাগ করিয়া বাছা বাছা রমণীর পাণি গ্রহণ করেন তাহারা কি কায়মী বিবাহিতদের (হিন্দুদের) চেয়ে দাম্পত্য সুখে অধিক সুখী?
রসায়ন শাস্ত্রের (Chemistry) নিয়মে দুইটি পদার্থের মিশ্রণ ঘটাইতে হইলে পূর্বেই জানা উচিত যে, পদার্থ দুইটি মিশ্রণযোগ্য কি না। কেহ যদি জলের সহিত বালু বা খড়িমাটি মিশাইতে চায় তাহা পারিবেন না। সাধারণত তৈল ও জল একত্র মিশে না। তবে উহা একত্র করিয়া বিশেষভাবে রগড়াইলে সাময়িকভাবে মিশিয়া পুনরায় বিযুক্ত হয়। কিন্তু চিনি বা লবণ জলে মিশাইলে উহা নির্বিঘ্নে এক হইয়া যায়। বিবাহ ব্যাপারে পাত্র-পাত্রী নির্বাচনও এইরূপ একটি মিশ্রণ।
পাত্র ও পাত্রী মৌলিক চরিত্রসমূহ শেষোক্ত পদার্থের ন্যায় মিশুক কি-না, তাহা বিচার না করিয়া- জল-খড়ি ও তৈল-জল মিশ্রণের মত যথেচ্ছা মিলন প্রচেষ্টার বিফলতাই “তালাক” প্রথার কারণ নয় কি?
এতদ্দেশে অনেক হিন্দুর ভিতর কোষ্ঠী ও ঠিকুজীর সাহায্যে বিবাহ পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের প্রচেষ্টা চলিতে দেখা যায়। মানুষের জন্ম মুহূর্তে তিথি, লগ্ন ও রাশির সংস্থান এবং চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্রাদির আকারে বিশেষ স্থানে অধিষ্ঠান জাতকের দেহ-মনের উপর কতখানি প্রভাব বিস্তার করিতে পারে আর এ বিষয়ে ফলিত জ্যোতিষ (Astrology)-এর সিদ্ধান্ত অভ্রান্ত কি না তাহা জানি না। কিন্তু ইহাতে অন্তত ইহাই প্রমাণিত হয় যে, হিন্দুগণ জানিতে চেষ্টা করেন যে, বিবাহে বর-কন্যার মিল হইবে কি না। মুসলমানদের বিবাহ প্রথায় পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে যদি কোনরূপ মনোবিজ্ঞান সম্মত বিচার প্রণালী উদ্ভাবন ও প্রবর্তন করা যাইত, তাহা হইলে তালাক প্রথা এত অধিক প্রসারলাভ করিত না।
স্বামী ও স্ত্রীর মনোবৃত্তি বা স্বভাবের বৈষম্য বশতই যে বিবাহ বন্ধন ছিন্ন হয়, তাহা সুনিশ্চিত। তবে এই বৈষম্য দুই প্রকারে হইতে পারে। কোন ক্ষেত্রে হয়তো স্ত্রীই দোষী, কিন্তু স্বামী সাধু ও সচ্চরিত্র। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে স্ত্রী সচ্চরিত্রা কিন্তু স্বামী অসচ্চরিত্র ও বদমায়েশ। ভালর সহিত মন্দর বিরোধ অবশ্যম্ভাবী। কাজেই উপরোক্ত যে কোন ক্ষেত্রেই স্বামী ও স্ত্রীর মনোমালিন্য হইতে পারে এবং তাহাতে বিবাহ বিচ্ছেদও ঘটিতে পারে। দোষ যাহারই হউক না কেন, বাহিরের লোক উহার বিশেষ কিছু জানিতে পারে না। কিন্তু পরিণাম উভয় ক্ষেত্রেই এক। অর্থাৎ স্ত্রী ত্যাগ।
তালাকের ঘটনা যেভাবেই ঘটুক না কেন, ত্যাজ্য স্ত্রীকে পুনঃগ্রহণে স্ত্রী যে নির্দোষ, ইহাই প্রমাণিত হয়। মনে হয় যে ক্রোধ, মোহাদি কোন রিপুর উত্তেজনায় স্বামী ক্ষণিকের জন্য আত্মবিস্মৃত হইয়াই অন্যায়ভাবে স্ত্রী ত্যাগ করে এবং পরে যখন সম্বিৎ (জ্ঞান) ফিরিয়া পায়, তখন স্থির মস্তিষ্কে সরলান্তঃকরণে ত্যাজ্য স্ত্রীকে পুনঃগ্রহণে বদ্ধপরিকর হয়। অর্থাৎ স্বামী যখন তার নিজের ভ্রম বুঝিতে পারে, তখনই ত্যাজ্য স্ত্রীকে পুনরায় গ্রহণ করিতে অভিলষিত হয়। ইহাতে দেখা যায় যে, স্ত্রীর উপর মিথ্যা দোষারোপ করিয়া অথবা ক্রোধাদির বশবর্তী হইয়া স্ত্রী ত্যাগে স্বামীই অন্যায়কারী বা পাপী। অথচ পুনঃগ্রহণযোগ্য নির্দোষ স্ত্রীকে পুনঃগ্রহণে “হিলা” প্রথার নিয়মে স্বামীর পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিতে হয় সেই নির্দোষ স্ত্রীকেই। অপরাধী স্বামীর অর্থদণ্ড, বেত্রাঘাত ইত্যাদি না-ই হউক, অন্ততঃ তওবা (পুনরায় পাপকর্ম না করিবার শপথ) পড়ার বিধান নাই, আছে নিষ্পাপিনী স্ত্রীর ইজ্জত হানির ব্যবস্থা। একের পাপে অন্যকে প্রায়শ্চিত্ত করিতে হয় কেন?
ত্যাগের পর স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে দাম্পত্যবন্ধন থাকে না বটে; কিন্তু দাম্পত্য ভাবটা কি সহজেই তাহাদের হৃদয় হইতে মুছিয়া যায়? যদি যায়-ই, তবে হিলা প্রথার নিয়মানুসারে অস্থায়ী (Temporary) কলেমাটা যে কোন লোকের সাথে বিশেষত পূর্ব স্বামীর চাচা, ফুফা, মামার সহিত না হইয়া প্রায়ই ভগ্নিপতি বা ঐ শ্রেণীর কুটুম্বদের সহিত হয় কেন? ত্যাগের পর স্বামী তার মস্তিষ্কের উত্তেজনা বা ক্রোধাদি বশত স্ত্রীর প্রতি কিছুদিন বীতস্পৃহ থাকিলেও সরলা
স্ত্রী সহজে স্বামীরূপ হৃদয় হইতে মুছিয়া ফেলিতে পারে না। এ অবস্থায় যদি সে স্বামীর পুনঃগ্রহণের কথা জানিতে পারে, তাহা হইলে তাহার হৃদয়পটে পূর্ব দাম্পত্য-জীবনের স্মৃতি আরও গাঢ়রূপে অঙ্কিত হয়।
এমতাবস্থায় স্ত্রী পূর্ব স্বামীর পুনঃগ্রহণের প্রস্তাবে সানন্দে সম্মতি দেয়। কিন্তু ইহার পরে হিলাকৃত নবীন দুলহার অস্থায়ী কলেমার ইজাব (সম্মতি) দেওয়াটা কি তার আন্তরিক?
হিলা প্রথায় বর নির্বাচনে বেশ একটু কারসাজী আছে। বয়স্কা হইলেও হিলাকৃত বর নির্বাচনে স্ত্রীর কোন অধিকার থাকে না, নির্বাচনকর্তা সর্বক্ষেত্রেই পূর্বস্বামী। প্রথমত সে বিচার করে যে, সিন্দুকের চাবি কাহার হস্তে দেওয়া উচিত। নবীন দুলহা তার হাতের লোক কি-না। সে তাহার নির্দেশমত সময়োচিত কাজ করিবে কি না। সর্বোপরি লক্ষ্য রাখা হয় যে, নবদম্পতির মধ্যে ভালবাসা জন্মিতে না পারে।
এইরূপ হিসাব মিলাইয়া প্রাক্তন স্বামীর দ্বারা বর নির্বাচিত হইলে, সেই বিবাহকালীন স্ত্রীর ইজাব বা সম্পত্তির কোন মূল্যই থাকিতে পারে না বা থাকে না। স্ত্রী সম্মতি যাহা দিল তাহা তাহার পূর্ব-স্বামী লাভের জন্য, হাল স্বামীর জন্য নয়। অর্থাৎ সে জানে যে, তার এই বিবাহ মাত্র একদিনের জন্য এবং এই বিবাহের মাধ্যমেই হইবে তার পূর্ব স্বামী লাভ। তখন সে মনে মনে এই সিদ্ধান্তই করে--
“মোর বাড়ী আর স্বামীর বাড়ী মধ্যখানে নদী
কেমনে যাব এই খেওয়া পার না হই যদি?”
ফলত স্ত্রী মুখে ইজাব দিল নূতন দুলহার আর অন্তরে কামনা করিল পূর্ব স্বামীকে।
অতঃপর বাসর ঘর। এখানে নবীন দুলহার অত্যাচার সহ্য না করিলে শাস্ত্রমতে স্ত্রীর মুক্তির উপায় নাই। কাজেই-মান-অভিমান, লজ্জা-শরম বিসর্জন দিয়া স্ত্রী প্রভাতের অপেক্ষা করিতে থাকে। কিন্তু তার হৃদয় পূর্বস্বামীর উদ্দেশ্যে ব্যাকুলস্বরে গাহিতে থাকে­
“হয়ে তব অভিলাষী আমি এখন কারাবাসী,
বুকে মম চাপিল পাষাণ।
জানি না মোর কি-বা পাপ, কি কারণ এই পরিতাপ,
হবে না কি নিশি অবসান?”
নবদম্পতির এইরূপ মিলন ব্যভিচারের নামান্তর নয় কি?